ই-ট্রাফিকিং- এ ৮০ শতাংশ সড়কে দুর্ঘটনা কমে আসবে: বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি
শনিবার জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসে সিসি ক্যামেরা ব্যবহার করে ই- ট্রাফিকিং প্রসিকিউশন সিস্টেম চালুর দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। একইসঙ্গে ই-ট্রাফিকিং সিস্টেম চালু করা গেলে সড়কে দুর্ঘটনা ৮০ শতাংশ কমে আসবে বলে মনে করছে সংগঠনটি।
সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটের সাগর-রুনি মিলনায়তনে “সড়ক আইন ও বিধি অনুযায়ী সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত সকল নাগরিককে ক্ষতিপূরণ প্রদানের দাবী” তে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে ই-ট্রাফিং চালু ছাড়াও আরো ৫টি প্রস্তাব দিয়েছেন সংগঠনের মহাসচিব মোঃ মোজাম্মেল হক চৌধুরী।
দাবির সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেছেন, সড়ক দুর্ঘটনার মামলা বিশেষ গুরুত্বের সাথে নথিভুক্তি করা, বিশেষ নজরদারিতে তদন্ত করা, দ্রুততম সময়ে তদন্ত সম্পন্ন করা, দ্রুত বিচার নিষ্পতি করা গেলে এই সেক্টরে আইনের শাসন বাস্তবায়ন করা সক্ষম হবে। অনেক ক্ষেত্রে দুর দুরান্তের যাত্রীরা রাস্তায় সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মারা গেলে বা গুরুত্বর আহত হলে যানবাহন সনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই সারাদেশে সিসি ক্যামেরা পদ্ধতিতে ট্রাফিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা গেলে প্রতিটি মামলায় আসামী শনাক্ত করা সহজতর হবে। প্রতিটি ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা আমলে নেওয়া যাবে। তখন মানুষের মধ্যে আইন ভাঙ্গার প্রবনতা কমে আসতে বাধ্য হবে। এরই মধ্য দিয়ে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরত আনা সম্ভব। অন্যদিকে ট্রাফিক আইনের মামলায় প্রত্যেক গাড়ির মালিকের ব্যাংক হিসাবের সাথে সম্পৃক্ত রেখে ই-ট্রাফিকিং প্রসিকিউশন সিস্টেম চালু করে মামলার সাথে সাথে ব্যাংক হিসাব থেকে অটো জরিমানা আদায়ের পদ্ধতি চালু করা গেলে বাংলাদেশের ক্যান্টনমেন্ট এলাকা বা উন্নত বিশ্বের সড়ক মহাসড়কের মত এদেশের প্রতিটি চালকও দায়িত্বশীল আচরণ করতে বাধ্য হবে। চালকের বেতন ও কর্মঘন্টা সুনির্দিষ্ট করা। যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক যানবাহন আলাদা করা জরুরি। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে নিরাপদ সড়কের অঙ্গীকার থাকলেও সড়ক নিরাপত্তায় তেমন কোন অগ্রগতি নেই। তিনি মনে করেন, ই-ট্রাফিকিং সিস্টেম চালু করা গেলে সড়কে দুর্ঘটনা ৮০ শতাংশ কমে আসবে।
তিনি আরো বলেন, দেশের কর্মক্ষম ব্যক্তিরাই সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে। দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত ব্যক্তি এবং তাদের ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদের আর্থসামাজিক যে ক্ষতি হচ্ছে।
বুয়েটের এআরআই এর হিসেব বলছে, গত তিন বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় এমন ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা। কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা যদি নির্ভরশীল মানুষের তুলনায় বেশি হয়, তাহলে সেটিকে জনসংখ্যা বোনাস বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বলা হয়। বাংলাদেশ এ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের জন্য গর্ব করে। সড়ক দুর্ঘটনা এ গর্বের জায়গাতেই বেশি আঘাত হানছে। পুলিশের তথ্যভান্ডার বিশ্লেষণ করে এআরআই বলছে, গত এক দশকে দেশের সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের ৫৪ শতাংশের বয়স ১৬ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। আর দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের সাড়ে ১৮ শতাংশ শিশু। এদের বয়স ১৫ বছরের নিচে। যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাব মতে নিহতদের ৫১ শতাংশ একমাত্র উপার্যনক্ষম ব্যক্তি।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোঃ মোজাম্মেল হক চৌধুরী সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের ২০১৭ সালে প্রকাশ করা এক গবেষণায় প্রতিবেদন তুলে ধরে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় একজন কর্মক্ষম ব্যক্তি প্রাণ হারানোর কারণে ২৪ লাখ ৬২ হাজার ১০৬ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়। সেই হিসাবে জাতীয় অর্থনীতিতে প্রতিবছর ১৯৭০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে শুধু মাত্র সড়কে মুত্যৃর কারণে। তবে এর সঙ্গে দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তির পরিবারের অন্যান্যদের অর্থনৈতিক চাপ, কর্মক্ষেত্রের ক্ষতিসহ অন্যান্য বিষয় আমলে নেওয়া হয়নি। সেই হিসেবে প্রত্যেক নিহত ব্যক্তির পরিবার এই পরিমাণ অর্থ রাষ্ট্র থেকে ক্ষতি পূরণ পাওয়ার অধিকার রাখে। তবে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি দেশের যাত্রী সাধারণের পক্ষ থেকে নিহত প্রত্যেক পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা ও আহত ব্যক্তিকে ৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদান করার দাবী জানান তিনি। যদিও সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ এ অধীনে জারিকৃত বিধিমালা অনুযায়ী সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতদের আর্থিক সহায়তা তহবিল হতে নিহত ব্যক্তির পরিবারকে ৫ লাখ টাকা ও আহত অঙ্গহানী বা পঙ্গু হলে ৩ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান থাকলেও আইন কার্যকরের ৫ বছরের মাথায় গত তিন দিন আগে নামে মাত্র ১৬২ জনকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। বিআরটিএর পরিসংখ্যা অনুযায়ী চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পযন্ত ৪০১৬ সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৭২৭ জন নিহত ও ৫৭৮১ জন আহত হয়েছে। সেই হিসেবে নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীগণ ১৮৬ কোটি ৩৫ লক্ষ টাকা এবং আহত ব্যক্তিরা ১৭৩ কোটি ৪৩ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ পাওয়ার দাবীদার। অথচ গত বৃহস্পতিবার সরকারের পক্ষ থেকে নামে মাত্র ১৬২ জনকে ৭ কোটি ৮ লক্ষ টাকার ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। তিনি জরুরি ভিত্তিতে সড়ক পরিবহন বিধিমালা জারি পর থেকে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত প্রত্যেক নাগরিককে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার জন্য সরকারের অনুরোধ জানান। তিনি এ ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, মালিক-শ্রমিকদের প্রভাব ও আবেদনের সময়সীমা ১ মাস রাখাসহ নানা কারনে এই তহবিলে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতরা আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ করে নিম্মবর্ণিত দাবী দাওয়া তুলে ধরেন।
সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সহ-সভাপতি তাওহিদুল হক লিটন, প্রচার সম্পাদক মাহমুদুল হাসান রাসেল, কেন্দ্রীয় নেতা মোঃ মহসিন, মনজুর আলম মাষ্টার, আবু তালেব এবং সড়ক দুর্ঘটনায় ভিকটিম পরিবারের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন, রাহিলা আনজুম খুশব, আয়েশা খাতুন, পান্না আক্তার প্রমুখ।
সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার থাকলেও সড়ক নিরাপত্তায় দৃশ্যমান কোন কার্যক্রম নেই। আমাদের দীর্ঘদিনের দাবীর প্রেক্ষিতে বিআরটিএ ও সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে রোড সেইফটি ইউনিট গঠিত হলেও মূলত তারা টিভি মিডিয়ায় কথা বলা ছাড়া সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে তাদের কোন গবেষণা কার্যক্রম নেই। সড়ক পরিবহন মন্ত্রনালয়ে নানা ইউনিট ও প্রতি বছর ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ থাকলেও সড়ক দুর্ঘটনার মহামারি থেকে দেশ ও দেশের মানুষকে রক্ষায় কোন বাজেট নেই। এই মন্ত্রনালয়ে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কোন গবেষক নেই, গবেষণা নেই, কোন বাজেট বরাদ্দ নেই। ফলে প্রতি বছর সড়কে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি বাড়ছেই।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ৮ হাজার মানুষের প্রাণহানির তথ্য মিলেছে। সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, সড়কে প্রতিদিন ৬৪ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। এই তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় ২৩,৩৬০ জন মানুষের প্রাণহানি হচ্ছে। প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ আহত হচ্ছে। প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ৮০ হাজার মানুষ প্রতিবন্ধী হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে ১২ হাজারের বেশি ১৭ বছরের কম বয়সী শিশু। এ হিসাবে প্রতিদিন গড়ে ২২০ জন মানুষ প্রতিবন্ধী হচ্ছে কেবল সড়ক দুর্ঘটনায়। অন্যদিকে বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, সারা বিশে^ প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় ১৩ লাখ মানুষ মারা যায়। বাংলাদেশে মারা যায় ২৪,৯৫৪ জন। সংস্থাটির তথ্যমতে, হতাহতদের ৬৭ শতাংশই ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী। এক্ষেত্রে মৃত্যুর ঝুঁকিতে রয়েছে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি। সংস্থাটি দাবী করছে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনাজনিত জিডিপির ক্ষতি ৫.৩ শতাংশ।







